মঙ্গলবার, ১৭ই মার্চ ২০২৬, ৩রা চৈত্র ১৪৩২ | ই-পেপার
ব্রেকিং নিউজ:
  • সারাদেশে উপজেলা প্রতিনিধি নিয়োগ করা হচ্ছে। আগ্রহী হলে আপনার সিভি ই-মেইল করতে পারেন। ই-মেইল nagorikdesk@gmail.com
সংবাদ শিরোনাম:
  • ৫৪ জেলায় খাল খনন শুরু আজ
  • কমলাপুরে ঈদযাত্রার ঢল
  • “শিক্ষার্থীরা হোক জীবনের যোদ্ধা”—ডা. শফিকুরের বার্তা, রাজনীতিতে সংস্কার নিয়ে নাহিদের হুঁশিয়ারি
  • হরমুজে সামরিক জোটে ‘না’ ইউরোপের—ট্রাম্পের প্রস্তাবে অনাগ্রহ, কূটনীতিতেই ভরসা
  • খামেনির মৃত্যুর পর তেহরানে ‘সিংহাসনের লড়াই’—শেষে জয় মোজতবার
  • ইউরোপের দেশগুলো নাকচ করলো ট্রাম্পের হরমুজ আহ্বান, কূটনৈতিক পথেই গুরুত্ব দিচ্ছে যুক্তরাজ্য
  • শ্রাবন্তীর খোলামেলা স্বীকারোক্তি: "আইটেম গানে পারফর্ম করতে আমার দারুণ লাগে"
  • ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন চলবে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত
  • তিন ঘণ্টায় বগুড়া থেকে ঢাকা পৌঁছানোর ট্রেন চালু হবে
  • সংসদে সংবিধান নিয়ে উত্তপ্ত বিতর্ক

সাকিফ শামীম, ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ল্যাবএইড ক্যান্সার হাসপাতাল এন্ড সুপার স্পেশালিটি সেন্টার ল্যাবএইড

চামড়া শিল্পে বিশ্বজয়ের প্রস্তুতিঃ দরকার প্রযুক্তি ও নীতিগত সহায়তা

ডেস্ক রির্পোট

প্রকাশিত:
৩০ আগষ্ট ২০২৫, ১৫:১৩

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে চামড়া শিল্প একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তৈরি পোশাক শিল্পের পর এটিই দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত। তবে, এই শিল্পকে বিশ্ববাজারে শীর্ষস্থান দখল করতে হলে কেবল সম্ভাবনাকে কাজে লাগালেই চলবে না, বরং প্রয়োজন সুপরিকল্পিত কৌশল, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং যথাযথ নীতিগত সহায়তা। বিশ্বজুড়ে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের বাজার ৪০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি, যা ২০৩০ সালের মধ্যে বেড়ে ৫৫০ থেকে ৬০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই বিশাল বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব এখনো খুবই সীমিত। এই অংশীদারিত্ব বাড়াতে হলে আমাদের প্রস্তুতি হতে হবে বহুমুখী এবং সুদূরপ্রসারী।

পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের এখন পরিবেশবান্ধব এবং উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। হাজারীবাগের পুরনো ট্যানারিগুলো সাভারে স্থানান্তরিত হলেও, পরিবেশ দূষণ এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সাভারের চামড়া শিল্প নগরীতে কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (CETP) পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় নদী ও পরিবেশ দূষণ অব্যাহত রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করতে হলে আমাদের কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমানো এবং পরিবেশগত নিয়মকানুন মেনে চলা অপরিহার্য। এই লক্ষ্যে, উন্নতমানের রাসায়নিক ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে ট্যানিং প্রক্রিয়াকে আরও পরিবেশবান্ধব করার চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।

এছাড়াও, উৎপাদন প্রক্রিয়ার প্রতিটি স্তরে অটোমেশন এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার এই শিল্পের দক্ষতা ও গুণগত মান বৃদ্ধি করবে। লেদার পণ্য ডিজাইন থেকে শুরু করে ফিনিশিং পর্যন্ত উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার অপচয় এবং উৎপাদন খরচ হ্রাস করা সম্ভব। এতে আমাদের পণ্যগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে আরও বেশি প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের এই প্রযুক্তিগত রূপান্তরে উৎসাহিত করতে সহজ শর্তে ঋণ এবং সরকারি সহায়তা প্রদান করা জরুরি।

কাঁচামাল সংগ্রহ এবং সংরক্ষণেও আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করা প্রয়োজন। কাঁচা চামড়ার সঠিক সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে প্রতি বছর একটি বড় অংশ নষ্ট হয়ে যায়, যা শিল্পের জন্য বড় ক্ষতি। এই ক্ষতি কমাতে, আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ এবং দ্রুত প্রক্রিয়াজাতকরণ ইউনিটের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। একই সাথে, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা অর্জনের জন্য এই শিল্পের সাথে জড়িত ব্যবসাসমূহের সার্টিফিকেশন যেমন: ISO 14001 (পরিবেশ ব্যবস্থাপনা) এবং ISO 9001 (গুণগত মান ব্যবস্থাপনা) অর্জন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চামড়া শিল্পকে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে কেবল প্রযুক্তির ব্যবহারই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন যথাযথ নীতিগত সহায়তা। সরকারের পক্ষ থেকে এই খাতের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং স্থিতিশীল নীতি প্রণয়ন করা উচিত। শুল্ক ও করের ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড়, কাঁচামাল আমদানিতে সহজলভ্যতা এবং রপ্তানি প্রক্রিয়াকে আরও সহজীকরণ করলে শিল্প উদ্যোক্তারা উৎসাহিত হবেন। এছাড়াও সরকারকে নিম্নলিখিত বিষয়সমূহের উপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে এবং উন্নয়নের জন্য কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহন করা আবশ্যক।

  • গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D): এই শিল্পের উন্নয়নে গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন পণ্য উদ্ভাবন, পণ্যের গুণগত মান বৃদ্ধি এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণার জন্য সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারিত্ব (PPP) মডেল কার্যকর হতে পারে।
  • দক্ষ জনবল তৈরি: আধুনিক প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে কাজ করার জন্য দক্ষ জনবলের কোনো বিকল্প নেই। এই লক্ষ্যে, কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে চামড়া শিল্পের জন্য বিশেষায়িত কোর্স চালু করা, দক্ষ প্রশিক্ষক নিয়োগ দেওয়া এবং শিল্প-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করা প্রয়োজন।
  • ব্র্যান্ডিং ও বাজার সম্প্রসারণ: আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চামড়াজাত পণ্যের ব্র্যান্ডিং অত্যন্ত দুর্বল। বাংলাদেশের পণ্যগুলোকে উন্নত মানের পণ্য হিসেবে তুলে ধরার জন্য বিদেশে নিয়মিত প্রদর্শনী, ট্রেড ফেয়ার এবং রোড শো আয়োজন করা যেতে পারে। একইসাথে, নতুন বাজার, যেমন ল্যাটিন আমেরিকা এবং আফ্রিকায় প্রবেশ করার জন্য কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

চামড়া শিল্পে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে সরকার, শিল্প উদ্যোক্তা এবং শ্রমিক—সকলের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। কেবল রপ্তানি বাড়ানোর লক্ষ্য নয়, বরং পরিবেশ ও সামাজিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করে একটি টেকসই শিল্প গড়ে তোলা আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। বিশ্বব্যাপী ক্রেতারা এখন শুধু পণ্যের গুণগত মানই দেখেন না, বরং নৈতিক ও পরিবেশগত মানদণ্ডও যাচাই করেন।

এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করে বাংলাদেশ যদি চামড়া শিল্পকে আধুনিকীকরণ, পরিবেশবান্ধব এবং নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে শক্তিশালী করতে পারে, তবে এই শিল্প খুব দ্রুতই তৈরি পোশাক শিল্পের মতো দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে। এর ফলে কেবল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনই বাড়বে না, বরং লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত হবে এবং দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি আরও মজবুত হবে।

 

 

 


মন্তব্য করুন:

সম্পর্কিত খবর